27/08/2026
জাপানি রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির পথ বন্ধ নয়—ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত আবেদন
বাংলাদেশের রিকন্ডিশন্ড মোটরযান ব্যবসা কেবল গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের একটি খাত নয়; এটি কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, সরকারের রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জীবিকা।
বাংলাদেশে জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির ইতিহাস দীর্ঘদিনের। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আশির দশক থেকে জাপান থেকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি শুরু হয়। তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্য, স্থায়িত্ব, জাপানি হোম-মডেলের উন্নত প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশের ডানহাতি স্টিয়ারিং ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যের কারণে এসব গাড়ি ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছে। The Business Standard-এর প্রতিবেদন
এই খাতের অর্থনৈতিক অবদান
২০২৬ সালে BARVIDA-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী:
* রিকন্ডিশন্ড মোটরযান আমদানি ও বিপণন খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে।
* এ খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়।
* আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, আয়কর, রোড ট্যাক্স ও নিবন্ধন ফি ছাড়াও ব্যাংক, লিজিং ও বীমা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে এই খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
* প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। The Business Standard, The Daily Star
একটি গাড়ির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শুধু মালিক ও বিক্রয়কর্মীরাই যুক্ত নন। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন:
* শোরুমের কর্মকর্তা-কর্মচারী;
* ড্রাইভার ও পরিবহনকর্মী;
* মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও ওয়ার্কশপকর্মী;
* অটো পার্টস, টায়ার, ব্যাটারি ও লুব্রিকেন্ট ব্যবসায়ী;
* C&F এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট ও বন্দরকর্মী;
* নিলাম ও পরিদর্শন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান;
* ব্যাংক, বীমা ও লিজিং কোম্পানি;
* গাড়ি সাজসজ্জা, রং, ডেন্টিং ও সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান;
* বিআরটিএ, নিবন্ধন ও করসংক্রান্ত সেবা প্রদানকারী;
* নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র সেবাদাতা।
কোনো একজন ব্যবসায়ীর কার্যক্রম বন্ধ হলে শুধু একটি শোরুম বন্ধ হয় না; এর সঙ্গে যুক্ত বহু পরিবারের নিয়মিত আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং এ খাতের নীতিগত ক্ষতি জাতীয় অর্থনীতি, রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের ওপর ধারাবাহিক প্রভাব ফেলতে পারে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব
বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭২ সাল থেকে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্ক Strategic Partnership বা কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়। জাপান বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, রেল, মেট্রোরেল, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাপান দূতাবাস, ঢাকা
JICA বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করে আসছে। জাপান দীর্ঘদিন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। JICA Bangladesh
২০২৪ সালে বাংলাদেশে আমদানি করা গাড়ির উৎসগুলোর মধ্যে জাপান প্রায় ৩০৪ মিলিয়ন ডলার নিয়ে প্রথম এবং চীন প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। এটি বাংলাদেশের গাড়ির বাজারে জাপানি গাড়ির দীর্ঘদিনের গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব নির্দেশ করে। OEC—Bangladesh Car Imports
তবে কোনো একটি বাণিজ্যিক নীতির কারণে বাংলাদেশ–জাপান বন্ধুত্বে সরাসরি “ফাটল ধরবে”—এমন বক্তব্য দেওয়া যথাযথ হবে না। বরং বলা যায়, জাপানের পরিবেশবান্ধব ও মানসম্পন্ন রিকন্ডিশন্ড EV-এর জন্য আকস্মিকভাবে বাজার বন্ধ হয়ে গেলে জাপানি রপ্তানিকারক, নিলাম প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের নীতিগত ধারাবাহিকতা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। তাই দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রতি সম্মান রেখে নীতিটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে বৈষম্য কেন প্রশ্নবিদ্ধ
একদিকে সরকার পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও চার্জিং অবকাঠামোকে উৎসাহিত করছে; অন্যদিকে জাপানের মানসম্পন্ন রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানির পথ বন্ধ বা কঠিন করে দেওয়া হলে তা একই নীতির মধ্যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশন আমদানির উৎসে কর শূন্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার নিজেই বৈদ্যুতিক পরিবহনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। জাতীয় বাজেট বক্তৃতা ২০২৬–২৭
BARVIDA-এর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্র্যান্ড-নিউ যানবাহনের জন্য কিছু শুল্কসুবিধা দেওয়া হলেও রিকন্ডিশন্ড প্লাগ-ইন হাইব্রিডের ওপর ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। সংগঠনটি ব্র্যান্ড-নিউ ও রিকন্ডিশন্ড যানবাহনের জন্য সমান ও ন্যায্য শুল্কনীতির দাবি জানিয়েছে। Financial Express
আমরা ব্র্যান্ড-নিউ, চীনা বা কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের গাড়ির বিরোধিতা করছি না। বাংলাদেশের বাজারে ব্র্যান্ড-নিউ, স্থানীয়ভাবে সংযোজিত এবং জাপানি রিকন্ডিশন্ড—সব ধরনের গাড়িরই স্থান থাকা উচিত। আমাদের দাবি শুধু একটিই:
একই প্রযুক্তি, একই পরিবেশগত সুবিধা এবং একই শ্রেণির গাড়ির ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরন বা উৎপত্তির দেশ বিবেচনায় অযৌক্তিক বৈষম্য করা যাবে না।
ন্যায্য প্রতিযোগিতা মানে কাউকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিরাপত্তা, মান, ব্যাটারির স্বাস্থ্য, মূল্য, ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবার ভিত্তিতে ক্রেতাকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।
আমাদের সুনির্দিষ্ট আবেদন
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে আমাদের বিনীত আবেদন:
1. জাপানের রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির পথ বন্ধ করে দেওয়া সংশ্লিষ্ট বিধান বা প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা হোক।
2. প্রজ্ঞাপন চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, NBR, বাংলাদেশ কাস্টমস, শিল্প মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, BRTA, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, BIDA, BSTI, BARVIDA, EV বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে উন্মুক্ত অংশীজন সভা করা হোক।
3. ব্র্যান্ড-নিউ ও রিকন্ডিশন্ড EV-এর জন্য নিরাপত্তা, ব্যাটারি স্বাস্থ্য এবং মানের অভিন্ন ন্যূনতম নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
4. আমদানির সময় স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে Battery State of Health বা SOH Certificate বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
5. দুর্ঘটনাগ্রস্ত, পানিতে ডোবা, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বা গুরুতরভাবে মেরামত করা EV আমদানি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ রাখা হোক।
6. জাপানি গাড়ির ক্ষেত্রে JAAI/JEVIC অথবা সরকারস্বীকৃত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন সনদ, প্রকৃত মাইলেজ ও auction history যাচাই বাধ্যতামূলক করা হোক।
7. ব্র্যান্ড-নিউ ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্কায়নে স্বচ্ছ, যুক্তিসঙ্গত এবং বৈষম্যহীন পদ্ধতি চালু করা হোক।
8. EV ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার, নিরাপদ সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে পৃথক নীতিমালা করা হোক।
9. নির্দিষ্ট বয়সসীমা—যেমন সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের—এবং নির্দিষ্ট ন্যূনতম ব্যাটারি SOH নির্ধারণ করে মানসম্পন্ন রিকন্ডিশন্ড EV আমদানির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
10. নতুন, রিকন্ডিশন্ড এবং স্থানীয়ভাবে সংযোজিত—সব ব্যবসায়ীকে ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ দিয়ে গ্রাহকের পছন্দের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হোক।
যেসব প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি
* প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
* অর্থ মন্ত্রণালয়
* জাতীয় রাজস্ব বোর্ড—NBR
* বাংলাদেশ কাস্টমস ও কাস্টম হাউস, চট্টগ্রাম
* বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
* আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর—CCI&E
* শিল্প মন্ত্রণালয়
* সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ
* বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—BRTA
* পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়
* পরিবেশ অধিদপ্তর
* বাংলাদেশ ব্যাংক
* বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—BIDA
* বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন—BSTI
* অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ—ERD
* পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
* জাপান দূতাবাস, ঢাকা
* JICA Bangladesh
* BARVIDA
* FBCCI ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠন
শেষ কথা
আমরা কোনো দেশ, ব্র্যান্ড বা ব্র্যান্ড-নিউ গাড়ির ব্যবসার বিরুদ্ধে নই। আমরা চীনা EV-এরও বিরুদ্ধে নই। আমাদের দাবি হলো—বাংলাদেশের বাজারে যে গাড়ি নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, মানসম্পন্ন এবং ক্রেতার সামর্থ্যের মধ্যে, তাকে ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে।
একটি প্রতিষ্ঠিত খাতকে হঠাৎ সংকুচিত করে নয়, বরং মান নিয়ন্ত্রণ, ব্যাটারি পরীক্ষা, স্বচ্ছ শুল্কায়ন এবং শক্তিশালী নিবন্ধনব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।
বৈষম্যের ঠাঁই নাই।
ব্যবসা বন্ধ নয়—মান নিয়ন্ত্রণ করুন।
একচেটিয়া সুবিধা নয়—সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করুন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার প্রতি আমাদের অনেক আস্থা ও আশা। হাজার হাজার ব্যবসায়ী, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের জীবিকা, সরকারের রাজস্ব ও বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে জাপানি রিকন্ডিশন্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করবেন—এটাই আমাদের বিনীত প্রত্যাশা।